রয়টার্সের বিশ্লেষণ : জয়ের আশা বিএনপির, সেরা ফলের পথে জামায়াত

9 Feb 2026 - 14:27 PM
 0
রয়টার্সের বিশ্লেষণ : জয়ের আশা বিএনপির, সেরা ফলের পথে জামায়াত

৫ বছরের বেশি সময় পর সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ভোটের মাঠে বিএনপি এগিয়ে আছে বলে ধরা হচ্ছে, তবে ইসলামপন্থি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট এবার ইতিহাসের সেরা নির্বাচনী ফল করতে পারে। এমনটাই উঠে এসে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম রয়টার্সের বিশ্লেষণে।

বার্তাসংস্থা রয়টার্স বলছে, শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি ও পলায়নের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্যে এই ভোট বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা, অর্থনীতি ও আঞ্চলিক কূটনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। আসন্ন এই জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে প্রথমবারের মতো সক্রিয় ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাজনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে জেনারেশন জেড। বিশ্লেষকদের মতে, এই ভোট শুধু সরকার পরিবর্তনের নয়, দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণেরও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।

রয়টার্স বলছে, দীর্ঘ দেড় দশকের একচেটিয়া রাজনৈতিক প্রভাবের পর এক নতুন মোড়ে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে বছরের পর বছর ধরে নির্বাচনের সময় রাজপথে বিরোধীদের উপস্থিতি ছিল খুবই সীমিত। কখনও তারা নির্বাচন বর্জন করেছে, আবার কখনও শীর্ষ নেতাদের গণগ্রেপ্তারের কারণে তারা কার্যত মাঠের বাইরে ছিল। তবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে সেই চিত্র পুরোপুরি পাল্টে গেছে।

পলাতক হাসিনার আওয়ামী লীগ এখন নিষিদ্ধ। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে তার সরকার পতনে ভূমিকা রাখা অনেক তরুণ বলছেন, এই নির্বাচনই হতে যাচ্ছে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে ২০০৯ সালের পর প্রথম প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোট, যেবছর শেখ হাসিনা টানা ১৫ বছরের শাসন শুরু করেছিলেন।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এই নির্বাচনে জয়ী হবে বলে ‘ব্যাপকভাবে ধারণা’ করা হচ্ছে। তবে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন একটি জোট তাদেরকে শক্ত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে। এর পাশাপাশি ৩০ বছরের কম বয়সী জেন-জেড কর্মীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি নতুন দলও জামায়াতের সাথে জোট বেঁধেছে। হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে সক্রিয় থাকলেও তারা সেই জনসমর্থনকে স্বতন্ত্র নির্বাচনী শক্তিতে রূপ দিতে পারেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটে যদি স্পষ্ট রায় আসে, তাহলে ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরতে সহায়ক হবে। হাসিনার পতনের পর কয়েক মাসের অস্থিরতায় তৈরি পোশাক খাতসহ বড় শিল্প খাতগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর এটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশের জন্য বড় ধাক্কা।

এই নির্বাচনের ফলাফল দক্ষিণ এশিয়ার দেশটিতে আঞ্চলিক শক্তিধর চীন ও ভারতের ভূমিকার ওপরও প্রভাব ফেলবে। ঢাকার সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসি বলেন, এখনও ভোটারদের বড় একটি অংশ কোনও সিদ্ধান্ত নেননি। ফলাফলের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি বলেন, ‘ভোটের ফল নির্ধারণে কয়েকটি বিষয় প্রভাব ফেলবে। এর মধ্যে জেনারেশন জেডের ভোট বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মোট ভোটারের প্রায় এক-চতুর্থাংশই এই প্রজন্মের।

সারা দেশে বিএনপির ‘ধানের শীষ’ এবং জামায়াতের ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকসংবলিত সাদা-কালো পোস্টার ও ব্যানার খুঁটি, গাছ এবং সড়কের দেয়ালে ঝুলতে দেখা যাচ্ছে। এর সাথে রয়েছে বেশ কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রচারসামগ্রী। সড়কের মোড়ে মোড়ে দলীয় প্রতীক লাগানো অস্থায়ী কার্যালয় থেকে ভেসে আসছে প্রচারণার গান। আগের নির্বাচনের সাথে এর বড় পার্থক্য হলো— তখন সর্বত্রই আধিপত্য ছিল আওয়ামী লীগের ‘নৌকা’ প্রতীকের।

জনমত জরিপে ধারণা করা হচ্ছে, একসময় নিষিদ্ধ থাকা জামায়াত এবার তাদের ইতিহাসের সেরা নির্বাচনী ফল করতে পারে, যদিও দলটি এককভাবে সরকার গঠন নাও করতে পারে।বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের রায় আগামী দিনে বাংলাদেশে ভারত ও চীনের ভূমিকাও নতুনভাবে নির্ধারণ করবে। শেখ হাসিনাকে ভারতের ঘনিষ্ঠ হিসেবে দেখা হতো। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি নয়াদিল্লিতে পালিয়ে যান এবং সেখানেই অবস্থান করছেন। এরপর থেকেই বাংলাদেশে বেইজিংয়ের প্রভাব বেড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

জামায়াতের জেন-জেড মিত্র দলটি বলেছে, বাংলাদেশে ‘নয়াদিল্লির আধিপত্য’ তাদের অন্যতম উদ্বেগ। দলটির নেতারা সম্প্রতি চীনা কূটনীতিকদের সাথেও বৈঠক করেছেন। তবে ইসলামি নীতিতে পরিচালিত সমাজের পক্ষে অবস্থান নেয়া জামায়াত অবশ্য বলেছে, তারা কোনও দেশের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট নয়।

বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশে চরম দারিদ্র্যের হার এখনও বেশি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া এবং বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ায় ২০২২ সাল থেকে দেশটি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থা থেকে বিলিয়ন ডলার সহায়তা নিতে বাধ্য হয়েছে।

ঢাকাভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক ওপিনিয়ন স্টাডিজের জরিপ অনুযায়ী, ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের কাছে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ দুর্নীতি, এরপরই রয়েছে মূল্যস্ফীতি।

বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের প্রতি ভোটারদের আকর্ষণের বড় কারণ তাদের ‘পরিষ্কার ভাবমূর্তি’, ধর্মীয় অবস্থান নয়। জরিপে বলা হয়েছে, ভোটাররা নির্বাচনে অংশগ্রহণে আগ্রহী, ধর্মীয় বা প্রতীকি ইস্যুর চেয়ে দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন এবং দায়িত্বশীল, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব প্রত্যাশা করছেন।

সব মিলিয়ে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানকে পরবর্তী সরকারপ্রধান হওয়ার সবচেয়ে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে যদি জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট এগিয়ে যায়, তাহলে তাদের চেয়ারম্যান ডা. শফিকুর রহমানও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে থাকতে পারেন।

২১ বছর বয়সী ভোটার মোহাম্মদ রাকিব এবার প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন। তিনি বলেন, তিনি আশা করেন পরবর্তী সরকার মানুষকে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ ও ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ দেবে।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগকে নিয়ে সবাই অতীষ্ঠ হয়ে গিয়েছিল। জাতীয় নির্বাচনে মানুষ ভোটই দিতে পারত না, কারও কথা বলার সুযোগ ছিল না। আমি আশা করি, যে দলই ক্ষমতায় আসুক, তারা এই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে।