সিলেটে প্রার্থী ১০৫, কেন্দ্র ২,৮৮১, ঝুঁকিপূর্ণ সিলেটে ১১২৬
ত্রয়োদশ নির্বাচন ও গণভোট আজ, আমেজের মাঝে আছে শঙ্কাও
শঙ্কার সকল মেঘ উড়িয়ে অবশেষে আজ বহু প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। দীর্ঘ সতের বছরের আক্ষেপের এই ভোটকে ঘিরে গোটা দেশই এখন উৎসবমুখর। সিলেটের চিত্রও একই। নগর থেকে গ্রাম-সবজায়গাই ভোটের রঙে রঙিন। তবে এই আমেজের মাঝেও আছে নানা শঙ্কা!
আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে সাতটায় শুরু হয়ে একটানা বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত চলবে ভোট গ্রহণ। ভোটাররা দুটি ব্যালট পেপারে ভোট দেবেন। একটি সাদা ব্যালট, এটি হবে সংসদ সদস্য নির্বাচনের ব্যালট। আর গোলাপি ব্যালট হবে গণভোটের।
একইদিনে জাতীয় নির্বাচন এবং গণভোট দেশে এই প্রথম হতে যাচ্ছে। ২৪ পরবর্তী সংস্কারের লক্ষ্যে প্রণীত জুলাই জাতীয় সনদের বৈধতা নিশ্চিতে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেবেন ভোটাররা।এবার কার্যক্রম নিষিদ্ধ হয়ে আওয়ামী লীগ এবারের ভোটে অংশ নিতে পারছে না। বিএনপির মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে। তবে বেশ কয়েকটি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী জয়লাভ করতে পারেন বলেও আভাস রয়েছে। তবে কোন কোন আসনে ত্রিমুখী এবং চতুর্মুখী লড়াই হবে বলেও জানা গেছে।
অসীম প্রত্যাশার এবারের ভোট নিয়ে নানা জরিপও হয়েছে। ব্যবধানের মাত্রা একেক জরিপে একেক রকম এসেছে। যেমন ন্যারেটিভ/ আইআইএলডির জরিপে দুই দলের ব্যবধান মাত্র ১ দশমিক ১ শতাংশ। আবার ইনোভিশনের সর্বশেষ প্যানেল স্টাডিতে বিএনপি ২১ দশমিক ৮ পয়েন্টে এগিয়ে।
তবে জাতীয় নির্বাচনের আগে জামায়াতের ছাত্রসংগঠন দেশের প্রধান চারটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে। প্রথমবার ভোট দেবেন, এমন তরুণদের মধ্যে ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশের পছন্দ জামায়াত। বর্তমানে মোট ভোটারের ৪৪ শতাংশই জেন-জি বা তরুণ প্রজন্ম; সংখ্যায় যা প্রায় ৫ কোটি ৬০ লাখ। যদি তরুণদের ভোট দেওয়ার হার জাতীয় গড়ের চেয়ে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেশি হয়, তবে জামায়াতের আসনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
জরিপগুলোর তথ্য কী বলছে, কী আড়াল করছে এবং বাংলাদেশের ‘ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট’ (এমন এক নির্বাচনী ব্যবস্থা, যেখানে যে প্রার্থী সবচেয়ে বেশি ভোট পান, তিনিই জয়ী হন। ভোটের ব্যবধান যা-ই হোক) নির্বাচনী ব্যবস্থা কেন সামান্য ভোটের ব্যবধানকেও আসনের বড় ব্যবধানে রূপান্তর করবে; এটা নিয়ে চলছে বিশ্লেষণ।
তবে সব জরিপ ও আভাসের পরও তাকিয়ে থাকতে হবে আজকের গোধূলী লগ্ন পর্যন্ত। ভোটের লাইনে কত মানুষ, কাস্টিং রেইট কতো-তাঁর উপরই নির্ভর করবে শেষ হাসি কার। তবে বিজয়ের হাসি দেখার আগে ভোটের দিনের পরিস্থিতি নিয়ে আছে নানা শঙ্কা। সহিংসতার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছে না খোদ ইসিও। কারণ মোট ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে প্রায় ২৪ হাজার কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ। অর্থাৎ ৫৭ হাজার কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এরমাঝে সিলেট বিভাগের ১ হাজার ১২৬টি কেন্দ্রও রয়েছে।
নগরের বেশ ক’জন পথচারীর সাথে গতকাল এ প্রতিবেদকের কথা হয়। এরমাঝে একজন হলেন-একটি বেসরকারী ব্যাংকের চাকুরীজীবী। ভোট কেমন হবে-প্রশ্ন করলে তিনি বললেন, নির্বাচনে কিছু জায়গায় পেশী শক্তি প্রয়োগ হতে পারে এমন আশঙ্কা আমার আছে। অপর একজন হোটেল কর্মকর্তা বললেন, আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর দৃর্বলতাই শঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে ভোটের আগের দিন জুড়িতে প্রার্থীও উপস্থিতিতে প্রতিদ্বন্ধি প্রার্থীর ভাই ও সমর্থকদের উপর হামলা শঙ্কার মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। আরো অনেকের এক ও অভিন্ন মত।
আরো অনেক শঙ্কাও আছে সিলেটে। শুরুতে ভোটের দিনের পাস কার্ড নিয়ে কড়াকড়ি আরোপ করা হলেও শেষ দিনে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। নামে বেনামে প্রভাব খাটিয়ে পাস কার্ড সংগ্রহ করেছেন অনেকে। এটিও একটা শঙ্কার কারণ মনে করছেন অনেকে।
এছাড়া প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দুটি রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন দুই জোটের শীর্ষ নেতাদের অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগের মধ্য দিয়ে ভোটের মাঠে দানা বাঁধছে নানা শঙ্কা ও ভয়। এক দিনে দুটি ভোট এবং তার বিলম্বিত ফলাফলের সুযোগে নির্বাচনি ফল পাল্টে যেতে পাওে এমন অভিযোগও রয়েছে। ফলে সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে শঙ্কা ও ভয়। রাজনীতি বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীনেরও একই অভিমত। তিনি বলেন, এবারের ভোটে আনন্দ যতটা আছে, উৎকণ্ঠ তারচেয়ে বেশি।
ভোটের আমেজ যতটা থাকলে স্বাভাবিক বলা যেত, ততটা দেখছেন না রাজনীতি বিশ্লেষক ও ঢাবি অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহানও। এ অবস্থায়ও নির্বাচন কমিশন (ইসি) আশা করছে, এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ হতে পারে। ৩০০ আসনের মধ্যে শেরপুর-৩ আসনে এক প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ভোট স্থগিত থাকায় সেখানে নির্বাচন হচ্ছে না।
গেল বছর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এ বছর ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। তারপরই শুরু হয় যত জল্পনা-কল্পনা। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও নির্বাচন কমিশন শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ট্রেনে উঠতে পারবে কিনা সেটা নিয়েও তৈরি হয় নানা শঙ্কা। অবশ্য একগুচ্ছ চ্যালেঞ্জ সামনে রেখে জনগণের সেই প্রত্যাশা পূরণের একেবারেই দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে সরকার।
এদিকে, ভোটের আগের দিন বুধবার সকাল থেকে ‘মালামাল বিতরণ’ কেন্দ্র থেকে ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বরত প্রিজাইডিং অফিসাররা ব্যালট পেপারসহ অন্যান্য সামগ্রী বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। সকাল থেকেই কেন্দ্রের দায়িত্বরত প্রিজাইডিং অফিসারসহ আইশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কলেজ প্রাঙ্গণে আসতে থাকেন।
এই সুযোগে ভোট দিতে নগর ছাড়তে থাকে হাজার হাজার মানুষ। ফলে শহর থেকে গ্রাম-সবখানেই ভোট নিয়ে আলোচনা, কৌতূহল আর প্রাণচাঞ্চল্য চোখে পড়েছে। দেখা গেছে অজানা শঙ্কাও।
প্রার্থী ও ভোটার সংখ্যা :
এবারের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ ৫০টি রাজনৈতিক দলের মোট ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন। নারী প্রার্থী রয়েছেন মোট ৮৩ জন- দলীয় ৬৩ জন ও স্বতন্ত্র ২০ জন। পুরুষ প্রার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ৯৪৫ জন- দলীয় ১ হাজার ৬৯২ জন এবং স্বতন্ত্র ২৫৩ জন। এরমাঝে বিভাগের ১৯টি সংসদীয় আসনে মোট ১০৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
দলভিত্তিক প্রার্থী সংখ্যার হিসাবে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। দলটির ‘ধানের শীষ’ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ২৯১ জন। জামায়াতে ইসলামী ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকে ২২৯ জন প্রার্থী দিয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ২৫৮ জন প্রার্থী ‘হাতপাখা’ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন। জাতীয় পার্টির ১৯৮ জন প্রার্থী লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে রয়েছেন। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ৩২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ‘শাপলা কলি’ প্রতীকে। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি, ৭৬ জন প্রার্থী লড়ছেন ‘ফুটবল’ প্রতীক নিয়ে।
সারা দেশে মোট ভোটার প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার প্রায় ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন, নারী ভোটার প্রায় ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন এবং হিজড়া ভোটার ১ হাজার ২৩২ জন। আর সিলেট বিভাগে মোট ভোটার ৯১ লাখ ৬৮ হাজার ৬৬ জন। এর মাঝে প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেট জেলায় সবচেয়ে বেশি ভোটার রয়েছে। এখানে মোট ভোটার ৩১ লাখ ১৩ হাজার ৩৯৬ জন। হাওরবেষ্টিত সুনামগঞ্জ জেলায় বর্তমানে ভোটার সংখ্যা ২২ লাখ ৭৪ হাজার ১০৩ জন। চা বাগান অধ্যুষিত মৌলভীবাজার জেলায় মোট ভোটার ১৭ লাখ ৭২ হাজার ৬৮৮ জন।
হবিগঞ্জ জেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ২০ লাখ ৭ হাজার ৮৭৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১০ লাখ ৩২ হাজার ৩৪৫ জন, মহিলা ভোটার ৯ লাখ ৭৫ হাজার ৫০৬ জন এবং হিজড়া ভোটার রয়েছেন ২৮ জন।
কেন্দ্র কত :
সারাদেশে মোট ৪২ হাজার ৭৭৯টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে সাধারণ কেন্দ্র ২১ হাজার ২৭৩টি এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ২১ হাজার ৫০৬টি। ২৯৯টি কেন্দ্রে পোস্টাল ভোটের গণনা হবে।
সিলেট বিভাগের সংসদীয় ১৯টি আসনে ২ হাজার ৮৮১টি কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে সিলেটের ৬টি আসনে রয়েছে ১ হাজার ১৬, সুনামগঞ্জের ৫টি আসনে ৬৬৪, হবিগঞ্জের ৪টি আসনে ৬৪৭ ও মৌলভীবাজারের ৪টি আসনে ৫৫৪টি কেন্দ্র। এরমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ১ হাজার ১২৬টি কেন্দ্রের মধ্যে সিলেটের ৬টি আসনে ২১৭, সুনামগঞ্জের ৫টি আসনে ৪৫১, হবিগঞ্জের ৪টি আসনে ২৩৫ ও মৌলভীবাজারের ৪টি আসনে ২২৩টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা :
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে এ নির্বাচনকে ঘিরে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সশস্ত্র বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মিলিয়ে মাঠে থাকবেন প্রায় ৯ লাখ সদস্য। এর মধ্যে মূল দায়িত্বে থাকবেন পুলিশ ও আনসারের সাত লাখের বেশি সদস্য।সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে দায়িত্ব পালন করবেন ১ লাখ ৩ হাজার সেনাসদস্য। এছাড়া ৫ জেলার ১৭টি আসনে বিশেষ নজরদারিতে থাকবেন ৫ হাজার নৌবাহিনী ও ৩ হাজার ৫০০ বিমানবাহিনীর সদস্য। সীমান্ত ও উপকূলীয় এলাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিতে কাজ করবে বিজিবি ও কোস্টগার্ড।
নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে কারচুপি ও সহিংসতা ঠেকাতে ২৫ হাজার পুলিশ সদস্য বডিওর্ন ক্যামেরা পরে দায়িত্ব পালন করবেন। পাশাপাশি আকাশপথে নজরদারিতে থাকবে ৫০০-এর বেশি ড্রোন।
দেশের নির্বাচনি ইতিহাসে ভোট একদিকে উৎসবের প্রতীক হলেও; অন্যদিকে সহিংসতা, সংঘাত ও কেন্দ্র দখলের অভিযোগও রয়েছে। গত ১২টি জাতীয় নির্বাচনের মধ্যে মাত্র ৪টিতে শেষ পর্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশ বজায় ছিল। বাকি ৮টিতে ভোটের মর্যাদা রক্ষায় সরকার, নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সমালোচনার মুখে পড়ে।
পর্যবেক্ষণ ও গণমাধ্যম :
নির্বাচন পর্যবেক্ষণে রয়েছেন ৪৫ হাজার ৩৩০ জন দেশীয় এবং প্রায় ৩৫০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক। এছাড়া প্রায় ৯ হাজার ৭০০ জন সাংবাদিক নিবন্ধন করেছেন, যার মধ্যে বিদেশি সাংবাদিক প্রায় ১৫৬ জন।
ফলাফল :
জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের দুটি ব্যালট একসঙ্গে গণনা করা হবে। কেন্দ্র পর্যায়ে প্রাথমিক ফলাফল ঘোষণা করে তা রিটার্নিং কর্মকর্তার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হবে। কমিশন আশা করছে, অধিকাংশ আসনের ফলাফল মধ্যরাতের মধ্যেই জানা যাবে।